তোমার জন্য অপেক্ষা শেষ হয়
তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লে
নিজের জন্য অপেক্ষা শুরু হয় তখন
আর ঘুমোতে দেয়না একটুও
২০১৯ সালের মার্চ মাসে প্রাইম ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আমি এবং আমার কাছের মানুষরা যে প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হচ্ছি সেগুলো হলো "তোমার/ওর কি চাকরি চলে গিয়েছে?", "তোমার/ওর চাকরিটা কি ভালো ছিলোনা?", "চাকরিটা ভালো ছিলো তাহলে ছাড়লে কেন?", "এতো ভালো বেতনের চাকরি আর কি পাবে?", "তুমি কি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলে?", "ম্যানেজমেন্টের সাথে কি কোন সমস্যা হয়েছিল?", "চাকরিটা কি চুক্তিভিত্তিক ছিলো? চুক্তির মেয়াদ কি শেষ হয়ে গিয়েছিল?", "ব্যাংকে কি কাজ করতা যে ছেড়ে দিলা?" ইত্যাদি...ইত্যাদি...
আমি চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলাম। বিবিএ পড়বার সময় ব্যাবসা শুরু করেছিলাম একটা। বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক জায়গায় ঘুরে বাজারের বাস্তব জ্ঞান লাভের চেষ্টা করেছি তখন, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরিশ্রম করেছিলাম। ব্যাবসাটা লাভজনকও ছিল কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি, সমর্থনের অভাব ও পরিবারের ব্যাবসাবিরোধী মনোভাবের কারনে মনের মতো করে ব্যাবসাটা বেশিদিন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি। বিবিএ শেষ করে চাকরি খুঁজছিলাম চট্টগ্রামেই। কয়েকটা ইন্টারভিউ এ্যাটেন্ড করেছিলাম। পরীক্ষকরা কেউ কেউ বলেছিলেন "এই চাকরি তো তুমি করবেনা, কয়েকদিন পর এরচেয়ে ভালো চাকরি পাবে তারপর চলে যাবে।" কারো কারো প্রতিক্রিয়ায় মনে হয়েছিল ওই পদে কোন মেয়েকে ওনারা চান নি। একই সময়ে সমবয়সী অন্যদের মতো আমিও ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। ভালোই হচ্ছিল পরীক্ষাগুলো কিন্তু সফল হতে পারছিলাম না। সংসার সামলে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারলেও ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষাগুলো দেয়া ছিলো একেকটা উটকো ঝামেলার মতো। তাছাড়া উড়ো কথা শুনতাম যে চট্টগ্রামের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট ব্যাংকগুলো গ্রাহ্যই করেনা। সরকারি চাকরির চেষ্টা করছিলাম না কারন সরকারি অফিসগুলোর পরিবেশ আমার পছন্দ নয়। একদিন একজন আমাকে বলেছিল "প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট হয়ে তুমি ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনির পরীক্ষা দিচ্ছ? শুধু শুধু সময় নষ্ট করছো। তারচেয়ে ব্যাংকের ক্যাশ ডিপার্টমেন্ট কিংবা টিএ এইসব পদের জন্য চেষ্টা করো।" আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। অনিয়মিত ক্লাস ও সার্বিক পরিস্থিতি অপছন্দ হওয়ায় এক বছরের ক্রেডিট ট্রান্সফার করে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ শেষ করেছিলাম। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা যুগোপযোগী, নিয়মিত ও উচ্চমানসম্পন্ন ছিল, অন্তত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায়। যাই হোক মন্তব্যটা সেদিন আমার খুব লেগেছিল। আমি ঠিক করলাম ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষা আমি আর দেবোই না বরং প্রশ্নহীন যোগ্যতা অর্জন করবো যেন ব্যাংক আমাকে ডেকে নিয়ে চাকরি দেয়। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এ মাস্টার ইন ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হলাম। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হবার সাত দিনের মধ্যে আমার ব্যাচের প্রত্যেকের কয়েকটি লিডিং ব্যাংকে ইন্টারভিউ হলো এবং আমরা সবাইই ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে যোগদান করলাম। যাদের সেই তারিখ পর্যন্ত সিজিপিএ সবচেয়ে বেশি ছিল আমরা যোগ দিলাম প্রাইম ব্যাংকে কারন প্রাইম ব্যাংকের টপ ম্যানেজমেন্ট আমাদের অত্যন্ত সম্মান দিয়েছিল এবং তখনকার ইন্ডাস্ট্রি এমটি হায়ারিং রেটের চেয়ে বেশি বেতন ও সুযোগসুবিধা অফার করেছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির ০৬ তারিখের দুপুর ২:০০ টায় আমরা ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম, সেদিনই রাত ৯:০০ টায় আমরা সবাই চাকরির চুক্তিপত্রে সাক্ষর করেছিলাম। একবছর ট্রেইনিং এর পর করপোরেট ডিভিশানে আমার ও ব্যাচের মোট ছ'জনের স্থায়ী পোস্টিং হয়েছিল। প্রথমে মতিঝিলের পুরোনো ভবন তারপর গুলশানের সর্বাধুনিক দৃষ্টিনন্দন ভবনে কেটেছে ছয় বছরের কর্পোরেট লাইফ। শেষ পর্যন্ত কর্পোরেট কাস্টমার ডিল করে গেছি এ্যাসোসিয়েট রিলেশানশিপ ম্যানেজার হিসেবে। আমি ছিলাম অত্যন্ত সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন যার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে যোগ্য ও পেশাদারিদের একাংশের সঙ্গে। সেই চুড়ান্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ জায়গাটিতে সহকর্মীদের সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছিলাম আমি। ওরা আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল নিজের ওপর আরো বেশি করে। আমি শিখেছিলাম দিন শেষে ব্যাক্তিগত পছন্দ অপছন্দের উর্ধ্বে মূল্যায়িত হতে বাধ্য ব্যাক্তির পেশাদারিত্ব, সততা, যোগ্যতা ও পরিশ্রম। ওই ছয় বছরের করপোরেট লাইফ আমার কাছ থেকে নিয়েছে যতোটা দিয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় কথা আমি আমার কাজটাকে ভালোবাসতাম। রিয়েল লাইফে যখন এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড কোন ক্লায়েন্টকে সার্ভিস সল্যুশান দিতে পারতাম, দেশের কোন উন্নয়ন কাজের এপ্রেইজাল করতে পারতাম, কিংবা যখন কোন ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করতে পারতাম ঋণ পরিশোধ করতে তখন মনে হতো আমি ও আমার টিম সত্যিই সমাজের জন্য কিছু একটা করতে পারছি।
না। চাকরিটা আমার চলে যায়নি বা আমি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হইনি। কিংবা ম্যানেজমেন্টের সাথে আমার কোন ঝামেলাও হয়নি। বরং রেজিগনেশান লেটার সাবমিট করবার পর নিজের ডিভিশান তো বটেই অন্য ডিভিশানের সহকর্মীরাও আমাকে রেজিগনেশান ফিরিয়ে নিতে বলেছিল। কোন ক্লায়েন্ট বা বলেছিল তাদের প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে। কেউ বলেছিল "আমি ব্যাংক সুইচ করছি তুমিও চলো আমার সাথে"। এখন প্রশ্ন হলো, তবে কেন চাকরি ছেড়ে দিলাম?
জীবনটা আমার কাছে একটা একাগ্র যাত্রার মতো। উপভোগ্য ও দর্শনীয় একটা যাত্রা। তার আবার একাধিক বা বহু চলার পথ। প্রতিটা পথে চলবার জন্য, জানবার জন্য অন্য আর সব পথগুলোকে সাময়িকভাবে বা চিরকালের মতোই ছেড়ে এগিয়ে যেতে হয়। আবার কখনো প্রয়োজনে পিছিয়েও আসতে হয়। এই স্বপ্নময় জীবনে স্বপ্নগুলোকে পূরণ করতে কখনো খুব হিসেব করে ছক কষে চলতে হয় আবার কখনো স্বপ্নগ্রস্তের মতোও হেঁটে যেতে হয়। করপোরেট চাকরি করাটা আমার স্বপ্ন ছিল। অনেক মানুষের সাথে কাজ করবো ঝাঁ চকচকে পরিবেশে, মাস শেষে মোটা মাইনে পাবো, নিজের একটা পুঁজি হবে, নিজের আর প্রিয়জনের শখ ও প্রয়োজন মেটাবো। চাকরিতে যোগদান করাটা যেমন নিজের জীবনে নিজেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল, চাকরি ছেড়ে দেয়াটাও নিজেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কে কি ভাবলো তা নিয়ে ভাবিনি কখনো, এখনও ভাবিনা। উদ্দেশ্য নয়, লক্ষ্য নয়, কিছু স্বপ্ন এমন হয়, যার জন্য সবকিছু ছাড়া যায়, যার জন্য খুব অল্প সম্বলে জীবন পার করা যায়, সন্তুষ্ট থাকা যায়। তেমনি কিছু স্বপ্ন লালন করি নিজের ভেতর। প্রতিদিন স্বপ্নগ্রস্তের মতো একটু একটু এগিয়ে চলি। হেরে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যাই, আবার উঠে দাঁড়িয়ে এগোতে চেষ্টা করি। হেরে যাওয়া আমাকে ভাবায় না কারন পৃথিবীতে হেরে যাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি, হার-জিত, সফলতা-অসফলতা দিয়ে যোগ্যতার বিচার করা যায়না সত্যিকার অর্থে। জীবনের কাছ থেকে কি পেয়েছে কেউ কিংবা কি পায়নি তা শুধু ব্যাক্তি মানুষই জানে। মানুষের জন্ম পেয়েছি এক। দোয়েলের ফড়িঙের নয়। তবু এই পৃথিবীরই এক যাদুময় পথ ধরে এই জীবন যাত্রা। কি আর করবো, জন্মেছি, তৈরী হয়েছি এক হিসেবে কাঁচা, স্বপ্নগ্রস্ত মানুষ হয়ে।
সে ফিরে গেছে
সে ফিরে গেছে
সে ফিরে গেছে
সুবোধ মেয়েটি পথ চেয়ে ছিলো সারা সন্ধ্যা
বেশ হয়েছে
ভালো হয়েছে
খাসা হয়েছে
গলির মুখে বিড়ির দোকানে সুখী ট্যারা সন্ধ্যা
এ্যাই যাবি?
এ্যাই খাবি?
এ্যাই চলনা
পরী আলোয় মিটমিটে আর বেপরোয়া সন্ধ্যা
বিড়িটা দে
আগুনটা দে
দে বাংলাটাও
চাঁদের আলোয় প্রাণ কাঁদানো সর্বহারা সন্ধ্যা
ওদের বলো গাইতে একটা জন্মোৎসবের গান
আর বলো মৃদঙ্গটা বাজাতে মিষ্টি করে ঠুকে ঠুকে
হাতে হাত ধরে যেন নাচে ওরা গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে
সস্তা রঙবেরঙ চিকমিকে জর্জেটের নিচে
ওদের সরল পায়ের পাতাগুলোয় আনন্দ দেখতে দেখতে
আমি ভুলে যাবো
কেউ আমার নেই
কোন আশা নেই
কোথাও ঠাঁই নেই
ওদের পাতলা কোমরে রুক্ষতা
ওদের কন্ঠস্বর সবার মতো নয়
কাপড়ের বড় বড় ফুল আর শোলার গাঁজরায় সাজানো ওদের বেনুনি আর খোঁপা
রাস্তায় ওরা প্রতিবার আমার পথ আঁটকে বলতো
"সুন্দরী, টাকা দে"
এতো আহ্লাদ এতো অভিমান করতো যেন কতো চেনা
আমিও এক আহ্লাদি অভিমানি মেয়ে
ওদের বুঝতে দিইনি কখনো
কাউকেই কখনো বুঝতে দিইনি
আজ পান্থপথের মোড়ে ওদের দেখলাম বহুদিন পর
কোমর দুলিয়ে ওরা হাঁটছিল ট্রাফিক সিগনালে
"ও সুন্দরী আপু, কিছু টাকা দে, দে না..."
কি যে হলো হঠাৎ
ওদের ডেকে আনলাম এই উঠোনে
ওরা নাচছে মৃদঙ্গের তালে, গাইছে জন্মোৎসবের গান
এতো রঙ এতো সুর এতো আনন্দের করুন মহড়া
কোথাও দেখিনি আর
কিছু আর আশা করিনা কারো কাছে
নিজের কাছেও না
বেশি কিছু তো না ই
সামান্য কিছুও না
প্রিয়তম পাহাড় প্রিয়তম সমুদ্র
দুই চোখে ধরা দেয়
আর দিতেই থাকে
ঘন সবুজ জংলি গন্ধ
কিংবা নোনা স্বাদ
চাইলেই নিতে পারি যখন তখন
আর কি চাই?
যারা ছেড়ে গেছে
ওদের যাবারই ছিলো
আসলে ওরা ছিলোই না কোনদিন
ছেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক
না ফেরাটাই স্বাভাবিক
অদৃশ্য সমাধিগ্রস্ত শহরে
আমিও সমাধিস্ত একজন অচেনা
নিজেই নিজেকে রেশম আর সুরায় চুবিয়ে রেখেছি
অলৌকিক ক্ষমতা বলে নয়
এটাই চুড়ান্ত লৌকিক জ্ঞান
সময়ের সাথে না চলতে পারলেও
সময় সাথে সাথে পা মেলায়
এই মুখে লাবন্য নয়
আসলে পাপহীণ দৃষ্টি ধরে রাখি
তোমার বুকে যেন স্পন্দন খুঁজে পাইনা হঠাৎ
তুমি আকুল হয়ে ভালোবাসা খোঁজো
এই পাপহীণতা প্রশ্নহীণতা
তোমার বুকে বেঁধে এমন
আমারো ভীষণ কষ্ট হয়
কিছু আর চাওয়ার নেই তোমার কাছে
তাই অসহায় বোধ করি
কথা খুঁজে না পেয়ে আমরা শুধু বলি
"কেমন আছো?"
জীবন ছেড়ে যায়না কোনদিন
জীবনকে ছেড়ে যাই আমরা মাঝে মাঝে
তুমি ডুকরে ডুকরে কাঁদো
কিন্তু বুঝতে পারোনা কেমন ঠিক ব্যাথাটা
সূর্যাস্তের বর্ণিল বিমর্ষ ছবিটা
আমি গেঁথে রেখেছি মগজে চিরকালের মতো
আবেগগুলোর চিরকালের মতোই বন্দীদশা
তুমি ডুকরে ডুকরে কাঁদো
দোষ দাও সময়কে
যদিও ঠিক জানো
অফুরন্ত সময় কোন কাজে আসেনা
কিছু অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব নয়
তোমার প্রয়োজন ছিলো
বিপরীত স্পর্শ
গভীর দীর্ঘ্য চুম্বন
উদার অকুন্ঠিত শরীর
স্নেহ মমতা ভালোবাসা
মনোযোগ সময় সহানুভুতি
সততা সমর্থন সহযোগিতা
বিনিময় হয়না এইসব কিছুরই
কিন্তু এতো অপমান করলে
আর এতো ঘৃণাও করলে
আমি ছোটলোকের মতো ভাবতে থাকলাম
বিনিময়ে কি পেলাম?
1. A cozy hoodie
2. Nailpolish remover
3. Body butter
4. A new guitar
5. One set nylon strings
6. Milk bread
7. Anti hairfall pack
8. A pair of black shoes
9. Riped red chilli
10. Shaldon Cooper's roommate agreement
For granted I am
For granted forever
If I take away my heart
If I give it to some stranger
There's no difference but
My price goes a bit cheaper
What's the difference anyway
Cheap cheaper cheapest
Whatever my answer
I m to fail the test
I can't feel my glory
I lost a feeling my dear
Reputation isn't my worry
Nothing gives me a fear
If the price go down
I'll be a bit cheaper
For granted I am
For granted forever
১৪ ডিসেম্বর এলে একলা একলা চুপ করে বসে থাকতেই ইচ্ছে করে সারাদিন। এতো অসহায় আর অন্য কোনদিন লাগেনা। সেই কোন ছোটবেলা থেকে বাবাকে দুঃখ করে বলতে শুনেছি "ওরা যদি থাকতো সোনার বাংলাদেশ সোনার বাংলাদেশই হতো"। ছোটবেলায় ভালো বুঝতাম না। বুদ্ধি হবার পর থেকে বিষয়টা পরিষ্কার হতে শুরু করে। বুঝি সবকিছু নষ্টদের অধিকারে গেছে আমার জন্মেরও বহু আগে। নিমকহারামরা দখল করে নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ কতো সহজে। আর আজো চারিদিকে নিমকহারামদের বাচ্চারাই দাপিয়ে বেড়ায়। ওদের হাতেই টাকা, আর টাকা মানেই ক্ষমতা। ওরাই যত দূর প্রয়োজন নিচে নামতে পারে, ভোল পাল্টাতে পারে, নোংরামি করতে পারে, ষড়যন্ত্র করতে পারে, হিংস্রো হতে পারে। ওদের দৌরাত্ম্যে, ঔদ্ধত্বে, হিংস্রোতায়, নীচতায় দেশের সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছেও কেউ অসহায় হতে পারে, একা হতে পারে। এটাই ভবিতব্য ছিল। যাদের আদর্শ গড়ে দেবার কথা ছিল তাদের শেষ করে দিয়ে পিশাচের দল আজও সফল। আমাদের অর্থনীতির বিকাশ হলো, প্রযুক্তিগত বিকাশ হলো, জীবনযাপন উন্নত হলো, কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে আমরা অকৃতকার্যই রয়ে গেলাম। মন খারাপ করে বসে থাকি সারাদিন। ভাবি, সবকিছু নষ্টদের অধিকারেই থেকে যাবে চিরকাল? পঞ্চাশ বছর কেটে গেল। একটা জাতির মেরুদন্ড ফিরে পেতে আরো কতো বছর লাগবে?
জোৎস্না আপা পুকুর ঘাটে বাসন মাজছিল। ওর মুখে ওই উজ্জল রোদেও আঁধার ছিল। জোৎস্না আপার ভাইটা গুন্ডা তৈরী হচ্ছিল। ওর চোখে প্রতিশোধের আগুন ছিল। জোৎস্না আপার মা একটাও কথা বলছিল না। ওনার সব সম্পত্তি আর সব কথা কেড়ে নিয়েছিল ষড়যন্ত্র। জোৎস্না আপার বাবা কলেজের শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। ওনার একজন সৎ ও তুখোড় জনপ্রতিনিধি হবার কথা ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে।
জোৎস্না আপার বাবার লাশটা যখন পড়ে ছিল খালে, জোৎস্না আপার বয়স ছিল দুই আর জোৎস্না আপার ভাই ছিল জোৎস্না আপার মায়ের পেটের ভেতর। তখন ডিসেম্বর, ১৯৭১।
জোৎস্না আপার বাবাকে যারা হত্যা করেছে, জোৎস্না আপাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, জোৎস্না আপার ভাইকে যারা কষ্ট দিয়েছে, জোৎস্না আপার মাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, ওদের সবাইকে আমি সমানভাবে ঘৃণা করি। ওরা যেখানেই থাকুক, সবাই যেন সমান শাস্তি পায়। ওরা আমার কেউ না। ওরা বাংলাদেশের কেউ না। ওরা মানুষদের কেউ না।
মেয়েটা রাস্তার ধার দিয়ে এলোমেলো হেঁটে যাচ্ছিলো
ওর একপায়ে একটা চটি অন্য পায়ে চটি নেই
রাস্তার ধারের অষুধের দোকানিরা ওর কথা শুনছিল না
কেউ বেচতে চাইছিলনা না একটাও ঘুমের ওষুধ
আমি দেখেছিলাম ওকে চোখ খুলেই
একটা ছবির মতোই
সেদিন ও ভেবেছিল বুঝি হেরেই গেছে
আর হেরে গিয়েছিল তারচেয়েও বেশি এই শহরটা
শহরটা হেরেই আছে আজো
আর হেরে আছে একটা অসুস্থ নাটকের প্লটের কাছে
ঈশ্বর পালিয়েছে এ লোকালয় ছেড়ে বহু আগে
কেউ কাউকে বোঝেনা
কেউ পড়েনা কারো চোখ
এই নিষ্ঠুর দাবানলের শহরে কে কাকে পাপী বলবে?
কে শোনাবে কাকে সান্তনা বাণী?
পুড়ে খাক হয়ে শেষ হতে হতেও শেষ হয়না কিছু
এখানে সবাই সোনালী বাজ
সবাই অভিশপ্ত
আমার শরীরে আগুন
ঝুলে পড়ছে খসে পড়ছে গলে যাচ্ছে
চামড়া, মাংস, অন্ত্র
চোখদুটো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে যেতে দেখে নেয়
মেয়েটার পুড়তে পুড়তে এলোমেলো হেঁটে যাওয়া
জানিনা প্রতিটা মানুষের এমনই মনে হয় কি না? মনে হয় কিনা এ কোথায় এসে পড়লাম? এ কেমন প্রতিবেশ? এ কেমন সময়? শুধু ছোট, বড়, অগভীর, গভীর ক্ষত ছাড়া আর কিছুই যেন পাবার নেই জীবনের কাছ থেকে। রোমাঞ্চকর, চটুল কিংবা মশলাদার আড্ডা থেকে চিরকালই আনমনে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি গাছেদের কিংবা আগাছাদের জঙ্গলে কিংবা এক কোনে চেনা বা অচেনা ধুনেও একমনে নেচে গেছি কখনো। গাছেদের, পাখিদের, প্রজাপতিদের, পোকাদের বর্ণিল জীবনের সরলতা নেই মানুষের। মানুষ সঙ্গীতের মূর্ছনা হতে পারেনা, শব্দের তরঙ্গ হতে পারেনা, নাচের ছন্দ হতে পারেনা। চিরকাল একলা নিভৃতচারি হয়ে থেকেছি। মানুষের সঙ্গ ভাল লাগে। তাও। একটা ঘোরের মধ্যে যেন দেখে যাই এই প্রতিবেশ, এই সময়। ব্যাক্তি মানুষদের নিয়ে চর্চা করতে ভালো লাগেনা যদিও ব্যাক্তি মানুষই দেখায় সমাজের প্রতিরুপ। মানুষের সমাজ, পাখিদের নয়, ফড়িং কিংবা ফুলেদের তো নয়। ভেবেছিলাম এক অপারগ দর্শক হয়েই জীবন কাটিয়ে দেবো। সব মিথ্যে, সব প্রলোভন, সব কপটতা, সব ষড়যন্ত্রের ক্ষরণ দেখে দেখেই জীবন পার করে যাবো শুধু সহমর্মি হয়ে। কিন্তু মাঝে মাঝে সমস্ত অস্তিত্ব বিদ্রোহ করে বসে। বলে আর না। ছিঁড়ে দিতে ইচ্ছে করে সমস্ত মুখোশ, ইচ্ছে করে উন্মোচিত করে দিই সব নীচতাময় সত্য। হঠাৎ কখোনো বা করেও ফেলি। কিন্তু তারপরই মনে হয় কেন করলাম এমন? কি দরকার ছিল? অবাক লাগে নিজেরই দীণতা দেখে। দানবদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শেষে কি নিজেও দানব হয়ে গেলাম? ভাবি যাদের উপেক্ষা করেছি, ক্ষমা করেছি দশ বছর, বিশ বছর, কিংবা পঁচিশ বছর কিংবা আরো বেশি সময় ধরে প্রতিবার, বারবার, আজ কেন পারছিনা, চাইছিনা ক্ষমা করতে একটুও। থাকুকনা ওরা ওদের মতো যে যেখানে আছে। কেউ না জানুক ওরা তো জানে কতো ভার বয়ে যায় ওরা প্রতিদিন প্রতিক্ষণ... মুখোশের ভার, মিথ্যের ভার, নীচতার ভার, অপরাধের ভার, লুকোনো সত্যের ভার...
এবং অবশেষে আমি দ্বিতীয় বারের মতো প্রেমে পড়লাম। অনুভুতিটা প্রথমবারের মতোই প্রবল ছিল। কিন্তু প্রথমবার যেমন মস্তিষ্কে ভর করেছিল কোন এক অচেনা বীরপুরুষ এবারে নিজেকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে ভর করলো এক অচেনা কাপুরুষ। প্রথমবার যেমন আমার চেতনা নিজেকে উজাড় করে নিবেদন করতে থরথর করে কাঁপছিল এবারে সেই আমারি চেতনা নিজেকে লুকিয়ে রাখবার জন্য থরথর করে কাঁপতে থাকলো।
সত্যিকার অর্থে প্রেমে পড়া বিষয়টি বুঝতে বা নিজের মধ্যে অনুভব করতে সমবয়সী বন্ধুদের চাইতে হয়তো কিছু দেরিই হয়েছিল আমার। তাও অবশ্য আমি বুঝতে পারতাম না, কিন্তু যেদিন আমার ভীষণই বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন এক বন্ধু, যে ছিল বয়সে অনেকটাই বড় এবং অত্যন্ত জ্ঞানী এবং তৎকালীন সকল সৎকর্ম ও অপকর্মেরও সঙ্গী একরকম, তারচেয়েও বড় কথা যার প্রতিটি কথা আমি গুরুত্বের সাথে গ্রহন করতাম, আমার কাছে জানতে চাইলো আমি কাউকে ভালোবাসি কিনা? আমি উত্তর দিলাম "না তো।"
: সে কি! তুই কাউকে পছন্দ করিস না?
: না তো।
: কি বলিস! তুই কখনো কারো প্রেমে পড়িস নাই?
: নাহ!
: তোকে কেউ প্রেম নিবেদন করে নাই?
: করেছে। দুজন।
: তো তখন তুই কি করলি?
: জানিনা কেন যেন ফানি লাগছিল ব্যাপারটা আর খুব হাসি পাচ্ছিল।
: কি! কি বলস এসব?
: না, হাসি পাওয়াটা আসলে ঠিক উচিত হয় নাই। আরেহ... এভাবে রেগে যাচ্ছো কেন? বল্লাম তো হাসাটা একদম উচিত হয় নাই।
: রেগে আর কি হবে? আর রাগ করারও কিছু নাই। কিন্তু ব্যাপারটা তো চিন্তার বিষয়।
: এ্যাঁ!!!
: তুই শিওর যে তুই কাউকে ভালোবাসিস না? বা তুই কারো প্রেমে পড়িস নাই, শিওর তুই?
: হ্যাঁ... মানে তাইতো মনে হয়... ধূৎ... তুমি তো দেখি আমাকে কনফিজড করে দিচ্ছো! ... আরে নাহ। কনফিউজড কেন হবো? আসলেইতো এখোনো প্রেমে পড়ি নাই কারো।
: তোর বয়স কতো?
: সতেরো।
: এই শতাব্দীতে এই বয়সে তুই কারো প্রেমে কখনো পড়িস নাই এই কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস?
: আরেহ... আমি কি মিথ্যা বলতেসি? আশ্চর্য তো... যাও বিশ্বাস না করলে নাই।
: প্রেমে পড়িস নাই কখনো কারো???
: না।
: কেন???
: আরেহ চিৎকার করতেসো কেন? কাউকে ভালো না লাগলে আমি কি করবো?
: কাউকে ভালো লাগেনা মানে???
: এখনো লাগে নাই আর কি। তো তাতে হইসেটা কি???
: হবে আর কি? চিন্তা। চিন্তা হচ্ছে। বুঝলি?
: ধ্যুৎ! প্রসঙ্গটা বাদ দাও তো। কি শুরু করলা খামাখা খামাখা।
: আচ্ছা একটা কথা বলতো, তোর কি মেয়েদেরকে ভালো লাগে?
: হুম। লাগবেনা কেন? আরে দাঁড়াও দাঁড়াও... ভালো লাগা বলতে তুমি কি মিন করতেসো বলোতো?
: বলতে চাইছি... তুই কি মেয়েদের প্রেমে পড়িস?
: ...আই কান্ট বিলিভ দিস!!! তোমার এখন আমাকে লেসবিয়ান মনে হইতেসে??? মাই গড!!!
: না না... আমি শুধু জানতে চাইলাম আর কি... তুই আবার লেসবিয়ান কিনা।
: আনবিলিভেবল!!! না। আমি লেসবিয়ান না।
: আরে ক্ষেপতেসস কেন? লেসবিয়ান হইলেও প্রবলেম কি?
: নাহ। প্রবলেম নাই। কিন্তু আমি লেসবিয়ান না। ... কি শুরু করলা এগুলা। ধুৎ আমি বাসায় যাইগা। ধরো নাও এই চিপসের প্যাকেট। আজকে কাউয়াগোরে তুমি একলা একলাই চিপস খাওয়াও। আমি যাইগা।
: আরে দাঁড়া দাঁড়া। যাইসনা। আরে পাগল। বস এখানে। মাথাটা ঠান্ডা কর। এতো মাথা গরম করলে চলবে? মাথা ঠান্ডা কর। মাথা ঠান্ডা না করলে সমস্যার সমাধান হবে কি করে?
: সমস্যা মানে? কিসের সমস্যা।
: এই যে তোর কাউরে ভাল্লাগেনা। এটা সমস্যা না?
: ধুর। কি বলো এগুলা। বাল! আরে বুঝো আগে। যারা প্রেম করতেসে ওরাই আসলে সমস্যায় আছে কিন্তু। ফ্রেন্ডগুলারে তো দেখতেসি কয়দিন পরপরই ফ্যাচফ্যাচ কইরা কান্দে।
: তুই এখন আমারে বুঝাবি?
: না বুঝলে বুঝাবো না? আজব!
: হুম বুঝলাম।
: দ্যাখো আমিও যে কখনো ক্রাশ খাই নাই কোন পোলার ওপর তা কিন্তু ঠিক না। খাইসি। কিন্তু একটু কথাবার্তা বলার পর বা ধরো দুইদিন অবজার্ব করার পর দেখলাম একেকটা বড়োই বিরক্তিকর টাইপ পোলা। ওই যে বলেনা ত্যানা প্যাচাইন্না... কেমন জানি ত্যানা প্যাচাইন্না টাইপের... কাজকামে, চিন্তা ভাবনায় বা ধরো সেন্স ওব হিউমারের বড়ই কাহিল অবস্থা। আর বুঝছো তো পুতুপুতু টাইপের পোলা বা ধরো ঠিক তাও না... কি যে কই... ধরো চোখেমুখে যদি একটা বোল্ডনেস না থাকে বা ধরো অনেস্টি না থাকে বা ধরো তাও না ধরো... ধুর বাল। এত্তো কথা তোমারে ক্যান বলতেসি। ধুত। এত্তো কথা কওনের দরকার নাই। কাউরে এখোনো পাই নাই যার সাথে প্রেম করুম। এই হইলো মোদ্দা কথা।
: হুম। ভালোই তো পোলাগো অবজার্ভ করোস তার মানে।
: অবজার্ভ তো আমি সবাইরেই করি। করতে করতে অভ্যাস হইয়া গেসে। ছোডবেলা থেইকা এতো লাত্থি খাইসি। এখন আমার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স সেইরকম স্ট্রং। অবশ্য কাউরে বুঝতে দিই না।
: হুম। সেটা অবশ্য আসলেই বোঝা যায়না। তা তুইতো আমারেও অবজার্ভ করস তার মানে?
: তা তো করিই। যদিও করা না করা সমান।
: করা না করা সমান মানে?
: যা অবজার্ভ করার তো আগেই করসি। নতুন করে আর কি করবো। তুমি হইলা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ফরএভার। অবজার্ভ করলেও না করলেও।
: ওহ। ভালো। বেশ ভালো। তবে তোকেও অবজার্ভ করতে করতে আমারও একটা জিনিস মনে হচ্ছে...
: থামলা কেন? বলো কি মনে হচ্ছে?
: মনে হচ্ছে তুই আসলে কোনদিনই প্রেমে পড়বি না। তুই আসলে একদিন প্রেমে আছাড় খাবি। যেদিন সময় আসবে এমন আছাড় খাবি বুঝলি তো? কোমরের হাড় গোড় সব ভাঙবে তোর সেদিন।
আমি এক মুহুর্ত তাকিয়ে ছিলাম শুনে কিন্তু তারপরই এমন দম ফাটানো হাসি পেলো হাসতে হাসতে বললাম
: তোমার এক্সের তো লেইঞ্জাটাও বাগে পাওনা। আমারে হাতের কাছে পাইয়া অভিসম্পাত দিতেসো?
আবারো হাসতে হাসতে আমি চিপসের জাম্বো প্যাকেটটা হাতে নিয়ে উঠে চিপস ছড়াতে ছড়াতে সামনের দিকে হাঁটা দিলাম। পেছনে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে যেতে লাগলো " বেশি হাসিস না বুঝলি... যেদিন সত্যি সত্যি আছাড়টা খাবি বুঝবি..." আরো কতো কি বলছিলো কিন্তু আমি নিজের হাসির শব্দেই আর শুনতে পাচ্ছিলামনা। আমার চারপাশে তখন ওপাড়ার কাকগুলো আর তিনটা নেড়ি ভিড় করে আছে।
বিকেলে তো হেসেছিলাম খুব কিন্তু আমি সত্যি সত্যিই একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। সিনেমায় কেউ প্রেমে পড়লে মিউজিক বেজে ওঠে, জোরে বাতাস হয়, বৃষ্টি নামে। বন্ধুরা প্রেমে পড়লে ওরা খুশিতে ঝলমল করতে থাকে, অদৃশ্য ডানায় ভর করে ফুরফুরে মনে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।আর আমি যখন প্রেমে পড়বো তখন আসলে আমি প্রেমে আছাড় খাবো আর আমার কোমরের হাড়গোড় সব ভেঙ্গে যাবে। এ কেমন কথা? এ কেমন বিচার? আর এ কেমন বেস্ট ফ্রেন্ড আমার? এ কেমন ভবিষ্যৎবাণী?
সে যাই হোক, একদিন দমকা হাওয়ার মতো একটা প্রেম এলো জীবনে। বেপরোয়া উদার ঐশ্বর্যময় বেহিসেবী এক প্রেম। বেস্টফ্রেন্ডের ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হয়নি বলে খুব আনন্দেই দিন কাটছিল। কিন্তু তারপর এক মুহুর্তেই একদিন বুঝতে পারলাম আমি সত্যিই বেশ জোরেশোরেই একটা প্রেমের আছাড় খেয়েছি। বাস্তবিকভাবে কোমরের হাড়গোড় না ভাঙলেও মাথায় তো ভীষণই চোট লেগেছে আর আমি সেই আঘাতে সংজ্ঞা হারিয়ে একেবারে কোমায় চলে গেলাম। পৃথিবীতে সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলছিল কিন্তু আমি নিজের অস্তিত্ব পরিচয় হারিয়ে একটা অর্থহীন যুক্তিহীন আবর্তের কেন্দ্রে স্থির হয়ে রইলাম। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখি পৃথিবী বদলে গেছে অনেক। ভাবলাম যা হবার তা হয়েছে, নতুন করে সবকিছু শুরু করা যাক। বেস্ট ফ্রেন্ড দেখতে এলো আমাকে। জিজ্ঞেস করলো "কি রে কেমন? কি বুঝলি?" আমি বললাম "ঠিকই বলেছিলা তুমি। এ এক ভয়াবহ আছাড় খাইলাম। এ কবছর কোমাতেও কাটিয়ে এলাম। তা তুমি কেমন ছিলা এতোদিন?"
: তা বেশ ছিলাম। একটা ব্যাবসা শুরু করেছি বুঝলি। ভাবলাম এই যে আমার এতো জ্ঞান এতো বুদ্ধি তা এবারে কাজেকামে লাগানো যাক।
: ওহ। এটা বেশ ভালো খবর।
: ভাল না হইলেও ভালো। পেট চালাইতে পারতেসি এতেই আমি খুশি। তোর কথা বল। এবার কি করবি?
: জানিনা। তবে প্রেমে যে আর পড়বো না তা ঠিক করে নিয়েছি।
: ঠিক করে নিলি? এভাবে ঠিক করা যায়?
: হ্যাঁ। নিলাম তো ঠিক করে।
: নাহ। আমার তা মনে হয় না। মনে হচ্ছে আবার প্রেমে পড়বি তুই। পড়বি না, আছাড় খাবি। একটু অন্যরকম আছাড়। হাড়গোড় ভাঙবোনা কিন্তু যে জায়গাটায় আছাড়টা খাবি সেই জায়গাটা বিশেষ সুবিধার হইবো না।
: তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড না ওয়ার্স্ট এনিমি বলোতো? এইসব তোমার ভবিষ্যৎবাণী না অভিশাপ?
: সে তুই যা কিছু একটা ভাইবা নে বা ডিকশেনারিও দেইখা নে। আমার যেটা মনে হইতেসে সেইটাই বললাম।
কোমা থেকে ফিরে আসার আনন্দ আমার ফিকে হয়ে গেল। খোশ মেজাজের ভাবটা মুখে ধরে রাখলাম ঠিকই কিন্তু বুকের ভেতরটা মুষড়ে রইলো। কিছু নতুন বন্ধু জোটালাম, নতুন চুলের ছাঁট দিলাম, নতুন নতুন কাজে ব্যস্ত হলাম। এমনি দিন কাটতে কাটতে মনের ভয়টা যখন ঝাপসা হয়ে এলো তখন একদিন আবার কি করে যেন প্রেমে পড়ে গেলাম। ভয়ে আতঙ্কে একটা গর্তে ঢুকে পড়লাম আমি ঠিকই কিন্তু চেপে রাখতে পারলাম না খবরটা। ভবিষ্যৎবাণী ঠিক ফলে গেল। এতো নোংরা ভর্তি পেছল একটা জায়গায় আছাড় খেলাম আমার সারা গায়ে নোংরা লেগে গেল। উঠে কোনরকমে দাঁড়িয়ে বাড়ির পথ খুঁজতে লাগলাম। লোকে এসে সাহায্য করা বা বাড়ির পথ দেখিয়ে দেয়া তো দূর বরং আমার দিকে আঙুল তাক করে হো হো করে হাসতে লাগলো। চলতে চলতে বাড়ির পথ আর খুঁজেই পেলাম না। শেষে একটা আশ্রমে এসে পড়লাম। আশ্রমের লোকেদের দয়ার শরীর, ওরা আমাকে গোসল করার পানি দিল, নতুন পোষাক দিল, খেতে দিল, একটা নতুন কাজও দিল। আশ্রমের নতুন জীবনে দিন কাটাতে কাটাতে যখন মনটা হালকা হয়ে এলো তখন দেখি একদিন আশ্রমের সদর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখতে দেখতে দাঁত ক্যালাচ্ছে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি হাতের কাজ রেখে তাড়াতাড়ি হেঁটে ওর কাছে গেলাম "আরে তুমি? এখানে কি করে এলে? কেমন আছো?"
: ভালো আছি। এদিকটায় বেড়াতে এসেছিলাম। আশ্রমটা বেশ সুন্দর তাই উঁকি দিতেই দেখি তুই ঘুঁটে তুলছিস। তা বেশ আছিস মনে হয় এখানে?
: তা আছি। তোমাকে এতোদিন পর দেখে খুব ভালো লাগছে। আসো ভিতরে। এখানে খুব ভালো সিঙ্গাড়া আর মালাই চা বানায়। চলো তোমাকে খাওয়াবো।
হাতে চা সিঙ্গাড়া নিয়ে আমরা একটা জারুল গাছের নিচে বসলাম দুজন মুখোমুখি। আমি জিজ্ঞেস করলাম
: তা কি করতেসো তুমি এখন? ওহ, তুমি না ব্যাবসা শুরু করসিলা? তার কি খবর?
: ওইটা চলতেছে ওইটার মতোই। আমি বাইর হইয়া পড়সি শান্তির খোঁজে। আর সত্যি বলতে কি তোকেও খুঁজতেসি অনেকদিন ধরে।
: আমাকে? কেন?
: বাহ বাহ! তুইই তো বলসিলি বেস্ট ফ্রেন্ড আমরা! তো খুঁজবো না? নালাতে তো আছাড় খাইয়া পড়সিলি। জানার পর যাকেই জিজ্ঞেস করি শালারা শুধু হাসতে হাসতেই মইরা যায়। কয়েকজন জানাইলো সেইসময় হাসতে হাসতে ওরা এমনই সর্ষেফুল দেখতেসিলো যে খেয়ালই করেনাই ঠিক কোনদিকে গেসিলি তুই। বুঝ অবস্থাটা।
: হুম। বুঝতে পারসি। অনেক নোংরা লেগে গেসিল গায়ে। ধুয়ে নিসি পুরো একেবারে ভেতরে ঢুইকা পড়বার আগে। বাবা যা দূর্গন্ধ ছিল! ভাবসিলাম হয়তো এবার সারা শরীরে, মগজে আর মনেও পচন ধরে যাবে। নাহ! কিন্তু দেখলাম সময় থাকতে ধুয়ে নিলেই হইলো।
: বাহ বেশ! তা কি ঠিক করলি এখন? এই আশ্রমেই থাকবি?
: না হয়তো। এই ঘুঁটে বানানোর কাজটা খারাপ না বুঝলা। কিন্তু এবার আমিও বেরিয়ে পড়বো। নতুন নতুন অনেকগুলো গান বাঁধসি। ভাবতেসি নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে গানগুলা গাইবো।
: বাহ! এটা দারুন ভাবছিস। সত্যি তোকে নিয়ে গর্বই হচ্ছে আমার।
: হুম। ভাবতেসি তো বহুদিন ধরেই। ভাবতে ভাবতে জানো তো কেমন ভাবুকই হয়ে গেসি। কিসব ভবিষ্যৎবাণী করলা, সেসব ফইলাও গেল। তুমি শালা পুরাই একটা হারামি। এতো সাবধান হওয়ার পরও ভবিতব্য এড়ানো গেলো না। আর আমি আস্তে আস্তে একটা অন্য মানুষ হয়ে গেলাম।
: হুম। তাইতো দেখতে পাইতেসি। তা যা হইসে ভালোই হইসে বল?
: তা জানিনা। তবে আজকে নিজেরে নিয়া আমি একটা ভবিষ্যৎবাণী করবো। তোমারগুলোর মতোন ফলবো কিনা জানিনা। শুনবা তুমি?
: ফলবোনা কেন? ঠিক ফলবো। বল শুনি কি তোর ভবিষ্যৎবাণী?
: ভবিষ্যৎবাণী হইলো আমি আর প্রেমে পড়বোও না, আছাড়ও খাবো না। কেউ যদি আমার প্রেমে পড়ে তবে সে প্রেমে পড়বোনা বরং ভীষণ জোরে আছাড় খাইবো। আর সেইটা হইবো এক্কেবারেই নতুন কিসিমের আছাড়!
ওখানে একশোটা প্রদীপ জ্বালিয়েছিল কেউ
ওই যে নদীর ধারে যে কুটির ছিল
তার সামনে কেউ বুনেছিল নরম সবুজ ঘাস
গন্ধরাজ গাছটা ভরে উঠেছিল কলিতে
কখন যে গোলাপ গাছগুলো তরতর করে বেড়েছিল কেউ টেরই পায়নি
ওই প্রদীপের আলো
গন্ধরাজ গোলাপের সুগন্ধ
আর ঘাসের নম্রতার আবেশ নিয়ে
একটা শহুরে গান বেঁধে চলেছি আমি
কেউ যদি নাও শোনে
তবুও
ঈশ্বরহীন শহরে পাপ পূণ্যের বিচারক নেই কেউ
এখানে মানুষই মানুষের যমরাজ
নিষ্ঠুর মানুষগুলো মুখোমুখি
যেমন আয়নায় মুখোমুখি ছায়া
সবকিছু ক্ষয়ে যাবে অতীতের মতোই
প্রত্নতত্ববিদেরা খুঁজে নেবে সবকিছু হয়তো
শুধু খুঁজে পাবেনা মসজিদ মন্দীর গীর্জার শহরে ঈশ্বরহীনতা
আর হৃদয়ের ক্ষতগুলো
আর অলীক বাস্তবতার গানগুলো
Forever I Nurtured a Mysterious Bird Forever I nurtured a mysterious bird, which never discloses its identity. For this grief, my eyes ...